মোদী সরকারের দু-বছর : ‘উন্নয়নের’ মরীচিকা সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের অভিমুখে ‘বদল’

নরেন্দ্র মোদীর অতিমানবের ভাবমূর্তি নির্মাণে এবং তার হাতে ‘উন্নয়নের’ জাদুদন্ড থাকার আষাঢ়ে গল্প ছড়াতে প্রচার মাধ্যম কোমর বেঁধে নামে এবং এর উপর ভিত্তি করেই মোদী ক্ষমতায় আসেন। দু-বছর ক্ষমতায় থাকার পর লম্বা-চওড়া প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণে ব্যর্থতা এবং হিন্দু রাষ্ট্রের অভিমুখে সর্বনাশা পদক্ষেপগুলো গ্রহণের বাস্তবতাকে আড়াল করতে মোদী সরকার কর্পোরেট অর্থে চালিত প্রতারণা সৃষ্টি এবং বিজ্ঞাপনের সেই আগের কৌশলের আশ্রয়ই আবার নিচ্ছেন।

২০১৪-র নির্বাচনী প্রচারে মোদী মূল্যস্ফীতির অবসানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে মূল্যস্ফীতি অব্যাহত রয়েছে এবং ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে ৩০ শতাংশেরও বেশি। মোদী আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন – প্রতি বছর দু-কোটি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। বস্তুত, ২০০৯-এর পর থেকে ভারতে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি সবচেয়ে কম হয়েছে এবং ৮টি শ্রমনিবিড় ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান ২০,০০০ কমে গেছে। এমএনআরইজি-তেও কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় হ্রাস হয়েছে এবং সুপ্রীম কোর্টের হস্তক্ষেপের পরই এই খাতে টাকা মেটানো হয়। সরকার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে দেয় অর্থের ৫৫ শতাংশ ছাঁটাই করায় মঞ্জুরি কমিশন এক নতুন নীতি ঘোষণা করেছে যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পদে ব্যাপক ছাঁটাই হবে এবং বর্তমান শিক্ষকদের কাজের বোঝা বাড়বে। এতে শুধু তরুণ স্কলারদের চাকরির সম্ভাবনাই মার খাবে না, তা দেশের উচ্চ শিক্ষার মানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে।

কৃষক আত্মহত্যা অব্যাহত রয়েছে। কৃষি সঙ্কট, কৃষকদের দুর্দশা এবং তীব্র খরা পরিস্থিতির লাঘবে মোদী সরকার যখন কিছুই করছে না, তখন সরকারের মন্ত্রীরা এবং বিজেপি নেতৃবৃন্দ নিজেদের মধ্যে এমন সমস্ত মন্তব্যের প্রতিযোগিতা চালাচ্ছেন যা কৃষকদের অপমানিত ও হেয় করে তুলছে। কর্পোরেটদের দ্বারা উপজাতিদের জমি-গ্রাসকে সহজসাধ্য করে তুলতে বন অধিকার আইনগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে তোলা হয়েছে।

বিজেপি সভাপতি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, দেশে কালো টাকা ফিরিয়ে আনার মোদীর প্রতিশ্রুতি ছিল শূন্যগর্ভ বুলি। বস্তুত, মোদী সরকারকে ‘শূন্যগর্ভ বুলির সরকার’ বলে বলা যেতে পারে। ঢাকঢোল বাজিয়ে শুরু করা ‘জন ধন যোজনা’ বলতে গেলে সচলই হয়নি, কেননা ২৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কে জমার পরিমাণ শূন্য এবং ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির দুটি করে অ্যাকাউন্ট দেখা গেছে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্প তেমন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারেনি; কিন্তু ‘ব্যবসায়ী উদ্যোগকে অনায়াস করে তোলার’ নামে শ্রম ও পরিবেশ আইনকে ধ্বংস ও দুর্বল করে তোলা এবং মজুরিকে দমিয়ে রাখার একটা কৌশল হয়ে উঠেছে ওই প্রকল্প।

নিজের সমর্থনে মোদী সরকার এই দাবিটুকু করতে পারে যে বড় মাপের কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারির কালি তার গায়ে এখনও লাগেনি। কিন্তু কেলেঙ্কারির নায়ক ললিত মোদী এবং ব্যাঙ্কের ঋণ খেলাপি বিজয় মাল্যকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করার ব্যাপারে মোদীর মন্ত্রীরা জড়িত। মোদী সরকার ব্যাঙ্কের ঋণ পরিশোধে নিকৃষ্ট অনাগ্রহীদের অন্যতম গৌতম আদানির ঋণ পরিশোধের সময়সীমাকে বাড়িয়ে দিয়েছে এবং আদানি হলেন মোদীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। মোদী ২০১৪-র নির্বাচনী প্রচারে যে বিষয়টিকে সবচেয়ে বড় করে দেখিয়েছিলেন সেই গুজরাট মডেলের স্বরূপও উদ্ঘাটিত হয়েছে এবং তা কর্মহীন বৃদ্ধি এবং বিপজ্জনক কাজের পরিবেশের বৃত্তান্ত বলেই প্রমাণিত হয়েছে। গুজরাট সরকার সম্প্রতি সুপ্রীম কোর্টে তিরস্কৃত হয় এবং শীর্ষ আদালত সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে নিহত পরিযায়ী উপজাতি শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। সরকারি কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি স্বীকার করেছে যে, মোদী যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখন তার সরকার নির্মাণ শ্রমিকদের কল্যাণে ‘কিছুই করেনি’, কর্মস্থলে মৃত ৭৩১ জনের মধ্যে মাত্র ৭ জনের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দেয়। মোদী সরকারের ‘দেশ বদল রহা হ্যায়’ শ্লোগান বাজপেয়ী সরকারের ‘ভারত উদয়’ শ্লোগানের মতোই শোনাচ্ছে, যে শ্নোগান ২০০৪-এর ভোটারদের কাছে নিজেদের জীবনের শোচনীয় পরিস্থিতির বিদ্রুপ বলেই মনে হয়েছিল। তবে দুরভিসন্ধিমূলক কিছু অভিমুখে ভারত অবশ্যই পাল্টাচ্ছে। মোদীর অধীনে দেশ এতটাই পাল্টে গেছে যে ‘গো মাংস ভক্ষণ’ বা ‘গো হত্যা করা’-র অভিযোগে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে; শাসক দলের নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ‘বেহায়া’ বলছেন এবং যাদবপুর থেকে বেনারস পর্যন্ত বিস্তৃত শিক্ষাঙ্গনে এবিভিপি-র ছেলেরা তাদের গায়ে হাত দিচ্ছে ও শ্লীলতাহানি করছে; সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বায়ত্ততা ও গণতন্ত্র কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে লাঞ্ছিত হচ্ছে; হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো ভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিবাহগুলোকে ‘লাভ জিহাদ’ বলে আখ্যা দিয়ে সেগুলোর উপর আক্রমণ চালাচ্ছে; রোহিত ভেমুলার প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা থেকে দাদরির নৃশংস হত্যা, দলিত শিশুদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারার মতো ভয়াবহ নির্মমতাগুলোর সমর্থনে যুক্তি দিয়ে এই সরকার অন্যদের থেকে নিজেকে বিশিষ্ট করে তুলেছে। সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে অভিযুক্ত হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোকে বেকসুর খালাস দেওয়া হচ্ছে; এই গোষ্ঠীগুলো যুক্তিবাদী পণ্ডিতদের হত্যায় মদত জুগিয়েছে; তারা আবার প্রকাশ্যেই সশস্ত্র ‘প্রশিক্ষণ শিবির’ চালাচ্ছে যেগুলো প্রণালিবদ্ধভাবে সাম্প্রদায়িক হিংসার প্রস্তুতি নেয়। স্কুলের পাঠ্যক্রমগুলোতে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের অনুকূলে পরিবর্তন আনা হচ্ছে – যে পাঠ্যক্রমের উদ্দেশ্য অল্প বয়সী পড়ুয়াদের মনে যুক্তিহীনতা ও ধর্মান্ধতা সঞ্চার করা।

মোদীর নেতৃত্বে ভারতকে সুনির্ধারিতভাবেই কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের পথে চালিত করা হচ্ছে। সরকারের দু-বছর পূর্তি উদযাপনের আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে তার বক্তৃতায় বিপজ্জনক অভিমুখে এই ‘পরিবর্তনকে’ মোদী ‘বিকাশবাদ’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে বর্ণনা করেছেন ‘বিরোধবাদ’ বলে। তার কর্পোরেটপন্থী সাম্প্রদায়িকমুখী নীতিগুলোর প্রতি প্রতিরোধকে ‘বিরোধবাদ’ বলে ছাপ মেরে দিয়ে নিজের অজান্তেই মোদী প্রকাশ করে দিয়েছেন যে, জনগনের আন্দোলনকে তিনি কতটা ভয় পান। কর্পোরেটদের জমি গ্রাসকে অনায়াস করে তুলতে একটি আইন পাশ করানোর তার প্রচেষ্টা কৃষক প্রতিরোধের মুখে বানচাল হয়ে যায়; বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাপ্য অর্থে ছাঁটকাট করা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অবাঞ্ছিতভাবে হস্তক্ষেপ করার তার নীতি ছাত্র ও শিক্ষকদের দৃঢ় ও অনুপ্রেরণাদায়ী প্রতিরোধের মুখে পড়েছে; সারা দেশে শ্রমিকদের প্রতিবাদ (বেঙ্গালুরুতে পোশাক তৈরির শ্রমিকদের প্রতিবাদ যার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত) সরকারের শ্রমিক-বিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে। নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ানোর যে প্রচার মোদী সরকার শুরু করেছে তা দেশের জনগণের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বিরোধিতা ও প্রতিরোধকে থামিয়ে দিতে পারবে না।

Back-to-previous-article
Top