ভারতের
নির্বাচন কমিশন (ইসি) আজ সবচেয়ে ধিক্কৃত নিন্দিত কলঙ্কিত সংস্থায় পরিণত
হয়েছে, যার বিশ্বাসযোগ্যতা এখন সর্বকালের
তলানিতে। বিহারের বুকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যেদিন ‘ভোট চোর, গদ্দি
ছোড়’ স্লোগান তুলে পদযাত্রা শুরু করে, অস্বাভাবিক ভাবে সেদিনই ইসি ঘটা করে এক সাংবাদিক সম্মেলন
ডাকে। আর, ঠিক ওইদিন সকালে ‘হিন্দু’
প্রকাশ করে সিএসডিএস’র এক সমীক্ষা। সেই সমীক্ষা দেখায়, গত ৩০-৪০
বছরের মধ্যে ভারতের নির্বাচন কমিশনের উপর দেশবাসীর বিশ্বাসযোগ্যতা ও আস্থা এর আগে এত তলানিতে কখনও নামেনি। আরও
অদ্ভুত ঘটনা হল, ইসি’কে সমালোচনা করার জন্য সিএসডিএসের বিরুদ্ধে সরকার এফআইআর দায়ের করে। ইসি’কে সমালোচনা করলে জবাব দিচ্ছে বিজেপি, মামলা করছে সরকার। স্বাধীন ভারত কবে এই খেলা দেখেছে
আগে?
স্বাধীনোত্তর ভারতে আজ পর্যন্ত কোন সাংবিধানিক সংস্থার বিরুদ্ধে এত সন্দেহ, সমালোচনার তির ছুটে আসেনি। আজ যে অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে উঠেছে, তা হল, এরা ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় সরকার, আরও নির্দিষ্টভাবে বিজেপির স্বার্থেই শুধু কাজ করেনি, বিগত লোকসভা নির্বাচনে এমন বহু আসনের ফলাফল বিজেপি-এনডিএ’র দিকে ঘুরিয়ে মোদী সরকারকে তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় বসাতে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষজ্ঞরা গভীর অনুসন্ধান, সমীক্ষা করে দেখিয়েছেন যে, ২০২৪’র গণরায় রীতিমতো সন্দেহজনক। হঠাৎ করে শেষ বেলায় যে ৫ কোটি ভোট বৃদ্ধি ঘটল তা খুব কম করে ১৫টি রাজ্যে ৭৯ আসনের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে বিজেপি-এনডিএ’র ঝুলিতে ভরে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তা যদি না হোত, তবে বিজেপি-এনডিএ’কে সন্তুষ্ট থাকতে হোত ২১৪টি আসনে আর বিরোধী দলের সম্মিলিত জোট পেত ৩০৩টি আসন!
এপ্রসঙ্গে আমরা পরে আলোচনা করব।
ইসি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ নির্বাচনী কারচুপির
শুধু ২০২৪’র নির্বাচনই নয়, ২০১৯’র সাধারণ নির্বাচন নিয়ে দেশের ৬৪ বর্ষীয়ান অবসরপ্রাপ্ত আমলা (যাঁরা তৈরি করেছেন
এক নাগরিক সংস্থা ‘কনস্টিটিউশানাল কন্ডাক্ট গ্রুপ’ বা সিসিজি) এবং ৮৩ জন সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার, শিক্ষাবিদ, এবং সাংবাদিকরা ২ জুলাই ২০১৯এ জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে কঠোর ভাষায় এক চিঠি
দিয়ে এই অভিযোগ করেন, “বিগত তিন বা তারও বেশি অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের মধ্যে ২০১৯’র সাধারণ নির্বাচন ছিল সবচেয়ে কম অবাধ ও সুষ্ঠ। অতীতে অপরাধী, বাহুবলী ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় দাপট দেখালেও, ইসি আপ্রাণ চেষ্টা চালাত সুষ্ঠু ও অবাধ
নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার। কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটা বলতে আমরা বাধ্য
হচ্ছি যে বর্তমান ইসি নিরপেক্ষতা স্বচ্ছতা সততা ও দক্ষতার সমস্ত সীমা পরিসীমাকে
হেলায় লঙ্ঘন করে সাংবিধানিক এই সংস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারে তলানিতে নিয়ে
এসেছে।” এই চিঠিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ আনা হয়। যারা এই
চিঠির স্বাক্ষরকারী, তাঁরা কর্মজীবনে অনেকগুলো নির্বাচন পরিচালনা ও সংগঠিত
করার দায়িত্বে ছিলেন। এই চিঠির কোন প্রাপ্তিস্বীকারও করেনি ইসি।
নির্বাচনী কারচুপি হয়েছে বেশ কয়েকটি স্তরে, ধাপে ও ভোটার তালিকা
তৈরি করার প্রক্রিয়ায়। একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা
প্রয়োজন।
অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর সব্যসাচী
দাশ এক গভীর গবেষণালব্ধ পেপার ‘ডেমোক্রাটিক ব্যাকস্লাইডিং ইন দ্য ওয়াল্ডস্ লার্জেস্ট ডেমোক্রাসি’, ৩১ জানুয়ারি ২০২৪এ প্রকাশ করেন।
রীতিমিতো হৈচৈ পড়ে যায় ওই পেপারটি প্রকাশ হওয়ার পর। ২০১৯’র সাধারণ নির্বাচনের প্যাটার্নকে গবেষণা করে তিনি দেখান, ভোটারের নাম
নথিভুক্তিকরণ, ভোটদানের সময় এমনকি গণনার পর্যায়ে বিরাট মাপের
কারচুপি হয়।
তিনি মহারাষ্ট্রের বেশ কিছু আসনে দেখান কিভাবে ইসি বিজেপির স্বার্থে বিরুদ্ধ দলের ভোটার, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের নাম ভোটার
তালিকা থেকে ব্যাপক হারে, নির্বিচারে বাদ দিয়েছে। যাদের কিছুতেই বাদ দেওয়া গেল
না, ভোটের সময় কিভাবে তাদের ভোটদান থেকে বিরত রাখা হল, তার প্রামাণ্য নথি
তিনি তুলে ধরেন। শুধু সংখ্যালঘুই নয়, যাদের মনে করা হয়েছে বিজেপি বিরোধী
ভোটার, সেই সমস্ত হিন্দু ভোটারদেরও নাম বাদ দেওয়া হয় ভোটার তালিকা থেকে। ২০২৪
সালের সাধারণ নির্বাচনে এই ধারা পরিলক্ষিত হয় বহু ক্ষেত্রে। বলাই বাহুল্য, ওই পেপার অশোকা
বিশ্ববিদ্যালয় স্বীকৃতি না দিয়ে অধ্যাপককে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। তার প্রতিবাদে
আরও বেশ কয়েকজন অধ্যাপক পদত্যাগ করেন।
কিভাবে ভোট চুরি করা হয়েছে
প্রথমেই বলা ভালো, ২০২৪’র জন্য ইসি যে সাত দফা ভোট গ্রহণের
সিদ্ধান্ত নেয়, তা যথেষ্ট সন্দেহজনক, যার পেছনে কোন
জোরালো যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না।
অন্ধ্রপ্রদেশের মোট ২৫টি লোকসভা আসনের জন্য ভোট গ্রহণ হয় একটাই পর্বে, কিন্তু ওড়িশার ২১ আসনের
জন্য ভোট হল চার দফায়। তামিলনাড়ুর ৩৯ আসনের জন্য ভোট হল একটাই পর্বে, কিন্তু মাত্র একটা
বেশি আসন বিহারের ভোট হল সাত দফায়।
ভোট প্রদানের চূড়ান্ত সংখ্যা বা হার আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা
করার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক বিলম্বের কোন বিশ্বাসযোগ্য কারণ আজ পর্যন্ত ইসি দেয়নি।
প্রথম পর্বে ভোট গ্রহণের ১১ দিন পর ইসি ঘোষণা করে চূড়ান্ত ভোটপ্রদানের সংখ্যা; আর দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম দফায়
অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোট প্রদানের সংখ্যা ইসি প্রকাশ করে যথাক্রমে ৪, ৪, ৪, ৩, ৩ এবং ৫ দিন পর।
একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে চণ্ডিগড়ের
মতো একটি ছোট্ট সংসদীয় ক্ষেত্রে মোট পোলিং বুথ ৬১৪ যেখানে ৪,৪৮,৫৪৭ ভোটার ভোট দেন।
ইসি এই ক্ষেত্রে ৫ দিন সময় নিল চূড়ান্ত ভোট প্রদানের সংখ্যা ঘোষণা করতে। তারপরও দেখা
গেল, প্রাথমিক (প্রভিশনাল) ও চূড়ান্ত ভোট প্রদানের সংখ্যার মধ্যে বিস্তর ফারাক – ৫.১৮ শতাংশ! ইসি আজ পর্যন্ত এই
অসঙ্গতির ব্যাখ্যা দিল না।
তার থেকেও বড় কথা, নির্বাচন হয়ে যাওয়ার এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও, আজ পর্যন্ত ইসি দ্বিতীয় পর্বের সমস্ত তথ্য পরিসংখ্যান প্রকাশ করল না।
ইসি আজ পর্যন্ত দিল না এই দ্বিতীয় পর্বে রাজ্য ভিত্তিক ও সংসদীয় আসন ভিত্তিক
প্রাথমিক ভোটপ্রদানের পরিসংখ্যান। আমাদের হাতে রয়েছে কেবল মাত্র চূড়ান্ত ভোট
প্রদানের তথ্য। এই পর্বে বিভিন্ন রাজ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ভোট প্রদানের মধ্যকার অসঙ্গতি আমাদের জানা
বোঝার বাইরেই থেকে গেল।
আর, এই দ্বিতীয় পর্বটিই
হচ্ছে রহস্যে মোড়া। এই কারণে এই দ্বিতীয় পর্বটি বিরাট সন্দেহ জাগিয়েছে, যে, দ্বিতীয় পর্বেই
এনডিএ-বিজেপির স্ট্রাইক রেট অস্বাভাবিকভাবে বেশি! উদাহরণস্বরূপ, এই পর্বে
উত্তরপ্রদেশের যে আটটি আসনে নির্বাচন হয়, সেই সমস্ত সংসদীয় আসনেই বিজেপি
জিতেছে। পশ্চিমবাংলায় ৩ আসনের মধ্যে ৩, মধ্যপ্রদেশে ৬’র মধ্যে ৬, ছত্তিসগড়ে ৩’র মধ্যে ৩, ত্রিপুরায় ১’র মধ্যে ১, জম্মু কাশ্মীরে ১’র মধ্যে ১, কর্নাটকে ১৪’র মধ্যে ১২, রাজস্থানে ১৩’র মধ্যে ১০ এবং
আসামে ৫’র মধ্যে ৪!
ভোটের হারে অস্বাভাবিক অসঙ্গতি
এক বিচিত্র ব্যাপার দেখা গেল। ভোটদান পর্ব শেষ হওয়ার পর ইসি ভোটপ্রদানের যে
সংখ্যা ঘোষণা করে, তার সাথে অনেকদিন বাদে ইসি’র ঘোষিত চূড়ান্ত ভোট
প্রদানের সংখ্যার মধ্যে বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক হারে অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেল। এই
অসঙ্গতির সংখ্যা হল ৪,৬৫,৪৬,৮৮৫, অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি!
অন্ধ্রপ্রদেশে এই বৃদ্ধির হার ১২.৫৪ শতাংশ, ওড়িশায় ১২.৪৮ শতাংশ। এই দুটো
রাজ্যেই বিজেপি-এনডিএ অস্বাভাবিক ভাল ফল পেয়েছে – অন্ধ্রপ্রদেশে ২৫’র মধ্যে ২১টি আসন, ওড়িশায় ২১’র মধ্যে ২০ আসন!
এরই বিরোধাভাসে উত্তরপ্রদেশের সাত দফার মধ্যে ৫টিতে
অসঙ্গতির হার ০.৫০ শতাংশের কম, আর এক্ষেত্রে তার আসন প্রাপ্তি ছিল কম।
যেমন, ৩ দফায়, অসঙ্গতির হার ০.২১ শতাংশ আর ১০টির মধ্যে মাত্র ৪টি
আসনে জয়লাভ করে।
৪, ৫, ৬, এবং ৭ দফায় শেষ পর্যন্ত প্রাপ্ত ভোটের অসঙ্গতির হার ছিল যথাক্রমে ০.৩৪ শতাংশ, ০.২৩ শতাংশ, ০.০১ শতাংশ এবং ০.২৫ শতাংশ। বিজেপি-এনডিএ’র স্কোরকার্ডে এই দফাগুলোতে
আসন লাভ হয় যথাক্রমে ১৩’র মধ্যে ৮, ১৪’র মধ্যে ৪, ১৪’র মধ্যে ৩, এবং ১৩’র মধ্যে ৭। এই পর্যায়ে বিজেপি-এনডিএ’র আসন সংখ্যা কমে
আসে – ২০১৯ সালে যেখানে ছিল ৬৪, ২০২৪এ তা এসে দাঁড়ায় ৩৬এ।
এটা চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল, প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ভোট প্রদান সংখ্যার
মধ্যে অসঙ্গতি অল্প হলে আসন সংখ্যা কম জুটেছে। কিন্তু, এর ব্যবধান যত
বেড়েছে, ততই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আসন সংখ্যা। তাই, বিজেপি-এনডিএ সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ইসি’র দ্বিতীয় দফার
কারচুপি ও কারসাজিতে।
ইসি’র থেকে প্রাপ্ত নির্বাচনী পরিসংখ্যান থেকে আরও একটি
গুরুতর অনিয়ম সামনে আসে, যা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। অ-সরকারি সংস্থা এডিআর
জানিয়েছে, ৫৪২টি আসনের মধ্যে ৫৩৮টি আসনেই প্রদত্ত ভোট ও ভোট গণনার মধ্যে গুরুতর
অসঙ্গতি উঠে এসেছে।
৫৪২টির মধ্যে মাত্র চারটি আসনে, অমরেলি-অটীঙ্গল-লাক্ষাদ্বীপ এবং
দামান ও দিউ ছাড়া, ইভিএমে প্রদত্ত ভোট প্রদানের নথি এবং ইসি’র পক্ষ থেকে ভোট
গণনার মধ্যে বড় মাত্রায় অসঙ্গতি ঘটেছে।
১৭৬টি আসনে, প্রদত্ত ভোটের তুলনায় ৩৫,০৯৩ বেশি ভোট গণনা
করা হয়েছে। ৩৬২ কেন্দ্রে ৫,৫৪,৫৯৮ কম ভোট গণনা করা হয়েছে। ৫৩৮টি কেন্দ্রে ৫,৮৯,৬৯১ ভোটের অসঙ্গতি
ধরা পড়েছে।
এই গুরুতর অসঙ্গতি কেন ঘটল তার কোন ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত ইসি দিল না।
আরও একটি বড় ধরনের বেনিয়ম ঘটেছে। ১ জুন ২০২৪ শেষ পর্বের নির্বাচন সংগঠিত হয়, আর গণনার পর ৪ জুন
ভোটের ফলাফল ঘোষিত হয়। কিন্তু ইসি সর্বশেষ পর্যায়ে নির্বাচনী পরিসংখ্যান ঘোষণা করে
দু’দিন পর, অর্থাৎ ৬ জুন তারিখে।
আরও একটি রহস্যজনক ঘটনা ঘটেছে ২০২৪’র নির্বাচনে ইসির তরফ থেকে পেশ করা
তথ্যকে কেন্দ্র করে। সমস্ত পর্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের রাজ্য ওয়াড়ি ও আসন ভিত্তিক
চূড়ান্ত ভোটের পরিসংখ্যান হাতে আসলেও কোনও পর্বেই আসন ভিত্তিক
প্রাথমিক ভোট প্রদানের তথ্য পাওয়া যায় নি, যা রীতিমতো এক রহস্য! এরমধ্যে আরও বড়
রহস্য হল, দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে, যে পর্বে বিজেপি-এনডিএ’র স্ট্রাইক রেট
অস্বাভাবিক রকম ভালো। আর তা হল, এই দ্বিতীয় পর্বের আসন ভিত্তিক ও রাজ্য
ভিত্তিক প্রাথমিক ভোট প্রদানের তথ্য ইসি আজও প্রকাশ করেনি!
অধ্যাপক সব্যসাচী দাশ তার গবেষণা পত্রে এটা দেখান যে গণহারে বৈধ ভোটারদের
নাম বাতিল করা হয়, বিপরীতে প্রচুর নতুন নাম যুক্ত হয় ভোটার তালিকায়। এই ধারা ২০২৪’র নির্বাচনের সময়েও পরিলক্ষিত হয়।
কিভাবে এই সব করা হয়েছে
যেকোনো নথিভুক্ত ভোটার ৭নং ফর্ম ফিল আপ করে তার কেন্দ্রে অন্য
কোন ব্যক্তির নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাতিল করার আবেদন করতে পারেন। কিন্তু, ২০২৫ সালে দিল্লীতে
ও পরের নির্বাচনগুলিতে ইসি বিজেপির প্রতি চরম পক্ষপাতমূলক ভূমিকা দেখায়। ফলে, নাম বাদ দেওয়ার আগে
বাধ্যতামূলকভাবে সংশ্লিষ্ট ভোটারকে ৭ দিনের নোটিশ দেওয়ার সময়সীমার যে নির্বাচনী বিধি রয়েছে তা ওই ক্ষেত্রে ইসি লঙ্ঘন করে, গণহারে ভোটার তালিকা
থেকে নাম বাদ দেয়। ফলে দেখা গেল, নির্বাচনের দিনে ভোটার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখেন যে
তালিকা থেকে তার নাম উধাও হয়েছে। যদিও আইনেই রয়েছে, অভিযোগকারির ঠিকানার
পাশাপাশি অন্য কোন ভোটারের ভোটাধিকার চ্যালেঞ্জ করার জন্য যথেষ্ট প্রমাণ দাখিল করতে
হবে। কিন্তু দেখা গেল, ২০২৫’র গোড়ায় এনসিটি দিল্লীতে নির্বাচনী
ঘোষণা হওয়ার পর বিরোধী রাজনৈতিক দলের ভোটারদের নাম গণহারে বাতিল করা হয়েছে, আর কোন ক্ষেত্রেই
বাতিল করার পূর্বে কোন নোটিশ তাদের দেওয়া হয় নি। ভোট দেওয়ার সময়ে, বুথে গিয়ে তারা জানতে পারেন যে তাদের নাম নেই
তালিকায়। ২০২৫এ দিল্লীর বিধানসভা নির্বাচনের আগে, ২০২৪’র ডিসেম্বরে অরবিন্দ
কেজরিওয়াল অভিযোগ করেন যে শাহদারা কেন্দ্রের ১১,০০০ ভোটারের নাম
তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে যাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই হলেন এলাকার নথিভুক্ত বাসিন্দা!
ইভিএমের কারচুপি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ ওঠে। দাবি ওঠে, ইভিএম প্রযুক্তি বিষয়ক স্বাধীন কোন বিশেষজ্ঞকে দিয়ে ইভিএমের মাইক্রোপ্রসেসরকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার, যা ইসি অচিরেই খারিজ করে দেয়। এরপর ২৮ এপ্রিল ২০২৪ সুপ্রিম কোর্ট যখন মাইক্রোপ্রসেসর পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য নির্দেশ দেয় তখন ইসি তা এড়াবার জন্য প্রতিটি মাইক্রোপ্রসেসার বাবদ ওই পরীক্ষার জন্য বিপুল অঙ্কের টাকা ধার্য করে বসে। এর থেকেও আরও নিন্দনীয় বিষয় হল, হরিয়ানা বিধানসভার নির্বাচনের সময়ে ইসি ইভিএমে কত ভোট পড়েছে তা ফের যাচাই করতে অস্বীকার করে, এমনকি তার সমস্ত তথ্য মুছে দেয়। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যে মামলা হয় তার নিষ্পত্তি এখনও হয় নি। কবে যে হবে তার ও কোন নিশ্চয়তা নেই।
২০২৪’র মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচন বহু প্রশ্ন, সন্দেহ তৈরি করেছে যার কোন বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা ইসি আজ পর্যন্ত দিতে পারে নি। কি কি সেই সমস্ত অসঙ্গতি যা আজও চর্চার বিষয়?
দেখা যাচ্ছে, যত ভোট পড়েছিল তার তুলনায় ৭৬টি কেন্দ্রে কম ভোট গোনা
হয়েছে। আর ১৯টি আসনে যত ভোট পড়েছে তার অনেক বেশি ভোট গোনা হয়েছে। এটা
বুঝিয়ে দেয়, বাড়তি অনেক ভোট পড়ে ভোট বাক্সে ফেলা হয়। আর সবচেয়ে বড়
যে ঘটনা ঘটে তা হল, রাত যত বেড়েছে, তাল দিয়ে বিপুল হারে বেড়েছে প্রদত্ত
ভোটের হার, যার কোন সদুত্তর ইসি আজও দিতে পারেনি।
মধ্যরাতে ভোট বৃদ্ধির রহস্য
বিকাল ৫.০০ পর্যন্ত ভোট প্রদানের হার ইসি’র তথ্য অনুযায়ী ছিল
৫৮.২২ শতাংশ। রাত যত গড়িয়েছে, লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে সেই ভোট প্রদানের হার – যা ৭.৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি হয়। এরফলে সর্বমোট প্রদত্ত ভোটের হার দাঁড়ায় ৬৬.০৫ শতাংশ। এটা বলার
অপেক্ষা রাখে না, এই বিপুল হারে ভোট বৃদ্ধির কারচুপি খোদ ইসি’র দৌলতে হয়েছে, যার জন্য
মহারাষ্ট্রে এনডিএ জোট অস্বাভাবিক ভালো ফলাফল করে। এই আচমকা ভোট বৃদ্ধির পেছনে কী
কারণ তার কোন বিশ্বাসযোগ্য উত্তর ইসি দেয় নি।
সাংবিধানিক সংস্থা হিসাবে সংবিধানের ৩২৪-৩২৬ অনুচ্ছেদ
অনুযায়ী ইসি অবাধ, স্বচ্ছ, পক্ষপাতহীন ভাবে নির্বাচন পরিচালনা
করতে দায়বদ্ধ। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কাছে নয়, সে দায়বদ্ধ ভারতের
জনগণের কাছে। কিন্তু মহারাষ্ট্র সহ বিহার ও একাধিক ঘটনা প্রমাণ করে ইসি তার
সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা পালনে গুরুতরভাবে ব্যর্থ হয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের স্বার্থবাহী
এক প্রতিষ্ঠানে অধঃপতিত হয়েছে। কোন ধরনের সমালোচনা, অভিযোগ শুনতে সে
প্রস্তুত নয়। উল্টে যিনি বা যারা অভিযোগ আনছেন তার যথাযথ উত্তর না দিয়ে
অভিযোগকারীকেই অভিযোগ প্রমাণের দায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
মোট ১১০ বার নির্বাচনী প্রচারে মোদী চরমতম ঘৃণা ভাষণ দিয়ে আদর্শ আচরণ
বিধিকে দুরমুশ করলেও ইসি কোন পদক্ষেপ নেয় নি। আজ পর্যন্ত কোন আরটিআই’এর উত্তর দেয় নি। কোন অভিযোগ সম্পর্কে
স্পষ্ট জবাবদিহি না দিয়ে প্রশ্নকর্তাকেই ধমকেছে, তাঁকেই তার প্রমাণের দায় চাপিয়েছে। বিহারে যে ৬৫ লক্ষ নাম
তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তা ইতিহাসে পৃথিবীর মধ্যে বৃহত্তম ভোটাধিকার হরণের ঘটনা।
নির্বিচারে বাদ দেওয়া হয়েছে লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক, মহিলা, যুবক, প্রান্তিক মানুষ সহ
বিপন্ন জনগোষ্ঠীর ভোটারদের।
এসআইআরের নামে যা চালু হল তা নিছক ভোটার তালিকার সংশোধন নয়, ভারতে গোটা
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার এক মৌলিক বদল। পরোক্ষে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কর্মসূচী শুরু হল
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পরিমার্জনের ছদ্মবেশে।
হিটলার করেছিল এথনিক ক্লিন্সিং বা ইহুদী জাতের
নির্মূলিকরণ। আর বিজেপি-আরএসএসের কর্পোরেট হিন্দুরাষ্ট্রের অভিমুখে এটা হল এক
অন্য ধরনের নির্মূলিকরণ – ভোটার তালিকা থেকে নাম নির্মূলিকরণ। বিপুল সংখ্যক ভারতবাসীর অত্যন্ত মৌলিক সাংবিধানিক ভোটাধিকারকে
ছিনিয়ে অধিকারহীন প্রজায় নিক্ষিপ্ত করার গভীর এক রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র।
এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে।
যে নিবন্ধ এবং নথির সাহায্য নেওয়া হয়েছে এই লেখার জন্য।
১) ডিসফাংশনাল ইসিআই – ওয়েপানাইজেশন অফ ইন্ডিয়া’জ ইলেক্টরাল সিস্টেম, ভোট ফর ডেমোক্রাসি।
২) দ্য ইসিআই’জ ক্রেডিবিলিটি ক্রাইসিস, পারাকালা প্রভাকর, দ্য ফ্রন্টলাইন।
৩) ডেমোক্রাটিক ব্যাকস্লাইডিং ইন দ্য ওয়ার্ল্ডস লার্জেস্ট ডেমোক্রাসি, সব্যসাচী দাশ।